লক্ষণরেখা...
লক্ষণরেখা...
--------//-------
শিল্পী মিত্র হাতি
আমি সোহেল, সোহেল রানা, একটি নামকরা প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার, নিজেও লিখি, লেখক হিসেবেই পরিচিতি বেশি। সম্প্রতি বেশ কিছু বই ভালোই কাটছে। তবে লিখি আমি ছদ্মনামে, 'রানা'। ফেসবুকের আ্যাকাউন্ট ও 'রানা'। ফলত, ফেসবুকে আমার অজস্র পাঠক, পাঠিকা, মহিলা ফ্যানেদের সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান।
ফেসবুকে সক্রিয় হয়ে পাঠকের কাছে লেখক খুব অল্প সময়ে পৌঁছতে পারছে। মন্দ নয় এ প্রযুক্তি। আমিও আজকাল অনেকটাই আ্যাকটিভ থাকি অবসরে।মধ্যপঞ্চাশ, বিবাহিত, সন্তানের জনক, কোন দিকেই আমার কোন অপূর্ণতা নেই। তবে রোজকারের গার্হস্থ জীবনে একটু একঘেয়েমি হয়ত এসে পড়েছিল, আর সেটাই বোধহয় ইন্ধন জোগাল আমার মনস্খলনের।
প্রেমে পড়েছিলাম, নাহ প্রেম বলব কি!! আসলে ভালবেসে ফেলেছিলাম এক নারীকে, বয়েসটা তারও মধ্যাহ্নে, পুরোপুরি সংসারী। ফেসবুকের লেখাতেই তার সাথে আমার পরিচয়, ক্রমশ হৃদ্যতা। কেমন লিখত সে? সত্যি বলতে কি, কোন গ্রেডই দেওয়া যায়না, আমি নিজে একজন প্রকাশক, তাই লেখার মৌতাত কার কতটা, সে চোখ আমার বরাবর প্রখর ছিল।
অজস্র ভুল বাংলা বানান প্রমাণ করত তার বিদ্যের সীমানাটা। তেমন কোন সাড়া জাগান গল্প, কবিতা কোনদিন সে লিখে তাক লাগাতে পারেনি, দু একটা যা পড়েছি, তার মান সাধারণের একটু উপরে রাখা যেতে পারে। বেশিটাই সে লিখত রোজনামচা। কিন্তু যা আমার চোখ টানত, মন টানত, তা ওর লেখার সহজতা, কেমন সাদামাটা, মেদহীন, সহজ, সরল ভাষায় করত সে আত্মউন্মোচন। বড় গভীর ছিল তার জীবনবোধ, আমি সেই সত্তাটিকে সম্মান করতাম।
আমি বিশ্বাস করি একজন লেখকের মনের আয়না তার সৃষ্টিতে সাক্ষরিত হয়, তাই তাকে একটি সুন্দর মনের মানুষ বলে মানতাম, মনের মাঝে তার একটি নির্মল আত্না বসত করত। সবাইকে নিয়ে বাঁচা, সবাইকে ভালবাসা, সবার জন্য একটু ত্যাগ স্বীকার এগুলো তো আজকাল কেমন ব্রাত্য মনে হয়। কী একটা সরলতা থাকত ওর লেখায়, আমি সব পোস্টগুলোই পড়তাম মন দিয়ে। ছবিতে দেখেছি তাকে, রূপের চটক বলতে তেমন কিছুই নয়, তেমন বৌদ্ধিক সৌন্দর্য ও তার ছিল না, শুধু ব্যতিক্রমী ছিল তার চোখ, কেমন যেন মায়াবী, ভালবাসার স্থলপদ্ম ফুটে থাকত তার চাউনিতে।
*********
একদিন তার একটা লেখা বড় ভাল লেগে গিয়েছিল, একটি ছোট মন্তব্যও করেছিলাম আর সেই প্রথম ওর বানানগুলো শুধরে দিয়েছিলাম। লেখক রানার কাছে এল এক প্রশ্ন, 'আপনি..ই কি সেই রানা?? বিখ্যাত লেখক রানা??' আসলে ভাবতেই পারেনি, 'কাঁটাতারের স্মৃতি' র লেখক রানা তার সামান্য লেখায় নিজে থেকে মন্তব্য করবে।উত্তরটা শুনে অবশ্যম্ভাবী ভাবে এসেছিল বন্ধুত্বের অনুরোধ, আমিও হাত বাড়ালাম। তবে এরপর তার বানানে প্রভূত উন্নতি লক্ষ্য করেছি, বুঝেছিলাম ছাত্রীর মনোযোগের গুরুত্ব।
তার লেখা পড়ার পর মন্তব্য শেষে একটি শব্দবন্ধ থাকত আমার তরফ থেকে, তার জন্য স্পেশাল বরাদ্দ থাকত, "ঝিঙেফুল"। কৌতূহলে জানতে চেয়েছিল, অর্থটা বলিনি কোনদিনই। আসলে মনে মনে তাকে আমি 'ঝিঙেফুল' বলেই ডাকতাম। ডাকসাইটে সুন্দরী ফুলেদের ব্রান্ডে যার নাম নেই, মরা মাচায় লতান অঙ্গ নিয়ে মাথা উঁচু করে থাকা হলুদ রঙের ফুল, যে স্বল্প আয়ূতেও কেমন প্রাণবন্ত, একটু হাওয়াতে নিজের মনে দুলতে থাকা গেরস্তের আঙিনা জুড়ে হাস্যময়ী ঐ গ্রাম্য ফুলটি যে আমার বড় ভাললাগার। ' গুল্মে পর্ণে/ লতিকার কর্ণে/ ঢল ঢল স্বর্ণে/ ঝলমল দোলে দুল/ ঝিঙে ফুল' নজরুলের কবিতায় সে সার্থক প্রকৃতই।
ফোন নম্বর নিয়েছিলাম। কথা বলতাম কখনও কখনও, গলার স্বরটা ভারী আবেগময় ছিল। ওই স্বরে মিশে থাকত কি অপার শ্রদ্ধা, সম্ভ্রম আর সমীহ। খুব কবিতা ভালবাসত, পড়তও, কথায় কথায় কবিতার লাইন বলে বসত, আমি কেন কবিতায় নেই এ প্রশ্নের উত্তরও তাকে দিতে হয়েছে। সে খুব সহজ ভাবেই এমন প্রশ্ন করত।
আমার অতি নাগরিক জীবনের চূড়ান্ত ব্যস্ততার মধ্যে সে এক সময় আমার কল্পনার স্বপনচারিণী হয়ে উঠল। আমার এ অনুভূতি একদম ছিল একতরফা, তার সাথে আমার মাঝে মাঝেই চলত এক নীরব কথপোকথন। বাসনমাজা, কুটনো কোটা, কলঘর, বড়ি দেওয়া, গাছে জল দেওয়া, উঠোন থেকে হঠাৎ আসা বৃষ্টিতে দৌঁড়ে জামা কাপড় তোলা, সারাদিন সংসারের গেরস্থালি কাজে কাটিয়ে দেওয়া এক নারীকে আমি দেখতে পেতাম মানসচক্ষে, আবার সব কাজ সেরে দিনান্তে কোন একটি সময় হয়ত কাগজে লিখছে তার জীবনলিপি, লিখছে তার যাপন। আসলে শহুরে ফ্যশন, পার্টি,গাড়ি,বাড়ি, গসিপ, গয়নার সম্ভারে নিজেদের দেখনদার করে তোলার এই কৃত্তিমতার মাঝে এমন একটি সাদামাটা বোধের মেয়েকে আমি ভালবেসে ফেললাম। আমার শূন্য রাতের মায়াবী আলোয় আমি আমার লেখার অনুপ্রেরণা খুঁজে পেলাম নতুন করে।
***********
এমনি করে মাস ছয় কাটার পর আমি যথারীতি একটা ভুল করে ফেললাম, আসলে আমরা পুরুষ তো, বহু শতাব্দী ধরে আমাদের রক্তকণিকায় বয়ে চলেছে অদৃশ্য এক অধিকারবোধের চোরাস্রোত, ঝিঙেফুল কে মাচা থেকে তুলে বসাতে চাইলাম আমার বহু সুসজ্জিত ব্যালকনির টবে, বুনোফুলের বন্য সৌন্দর্য কি আর কৃত্তিম টবে মানায়!!! আমরা ভুলে যাই, যে যেখানে সুন্দর, সেখানেই রাখতে হয়, জোর করে ফুলটাকে ছিঁড়তে চাইলে সে তো মূর্ছাবে। একদিন ফোনে তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বসলাম, আমার চোখে তাকে কোথায় দেখি বলে ফেললাম, সে প্রথমত অত্যন্ত বিষ্মিত এবং পরে ব্যথিত হয়েছিল।
কথা বন্ধ ছিল বেশ কিছুদিন, একদিন নিজে থেকেই ফোনে জানতে চাইলাম তার কঠোর প্রত্যাখানের কারণ, আমার বিধর্মী হওয়াটাই কি তার আপত্তির কারণ!! কিন্তু তা যে নয়, সে খুব সুন্দর করে বুঝিয়েছিল। তার ধর্ম অধর্ম বোধ ছিল আমার ধর্মবোধের থেকে অনেক উচ্চ মানের, অনায়াসে বলেছিল তার মানবিক ধর্মবোধের কথা। সে যে পরিবারের মাঝে মা-স্ত্রী-পুত্রবধূ এমন নানা সম্পর্কে সৎ থাকতে চায়, সেখান থেকে বিচ্যুত হওয়াটাই যে তার ধর্মচ্যুত হওয়া, সেই বিশ্বাসটা বলে চলেছিল তার গ্রাম্য কথার টানে।
আমি তার কাছে কিছুই প্রত্যাশা করিনি, কিছুই না, শুধু চেয়েছিলাম আমার ভালবাসাটা আদৃত হোক, স্বীকৃত হোক। এও বোধহয় আমাদের পুরুষের এক ধরনের অহংকারের মিথ্যে গোয়ার্তুমি, আমরা যে 'না' শুনতে অভ্যস্ত নই। আমি তো জানতাম, সে অত্যন্ত রক্ষণশীল, তার সংস্করাবদ্ধ একটা মন আছে। অথচ তার এই সংস্কার, তার একমাত্রিক নিজস্বতাই তো আমায় একদিন মুগ্ধ করেছিল।
সংসারকে বড় ভালবাসত, জীবনের অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে মাঝ বয়সের স্থায়ী সুখের আস্তানাটা কোন ভাবেই কলুষিত করতে চায়নি। তবু সে আমায় এতটা শ্রদ্ধা করত যে আমাকে যথেষ্ট সৌজন্যবোধ দেখিয়েছিল, 'আপনি' থেকে 'তুমি' তে নামতে দেয়নি এক মুহূর্তেও, নিজেও নামেনি শত অনুরোধে, অতি ভদ্র ভাবে বলেছিল সম্পর্কের লক্ষণরেখা না অতিক্রম করতে। তারপর তীব্র অপমানবোধে আহত আমি আর যোগাযোগ রাখিনি, প্রত্যাখাত হয়ে কষ্ট হয়েছিল কিন্তু ভদ্রতা আর শালীনতার লক্ষণরেখা অতিক্রম করতে কোনদিন রাবণ হতে পারিনি।
*********
একদিন অফিসে শত ব্যস্ততার মধ্যে এল একটি ফোন, অচেনা নম্বর থেকে। একটি অপরিচিত, আড়ষ্ট, বুঁজে যাওয়া কিশোরী কণ্ঠ বলছে 'আপনি সোহেল রানা? মুর্শিদাবাদ থেকে বলছি... আজ্ঞে আমার মার একটা... আ্যাকসিডেন্ট...ভাল নেই, গতকাল একবার আপনার নাম করছিলেন, একবার আসবেন!!!! বহরমপুর সেন্ট্রাল হাসপাতালে আছি.... হয়ত আপনাকে দেখতে চায়'... বাকিটা শুনতে পাইনি, সমস্ত পৃথিবীটা কেমন দুলে উঠল, মাথাটা টলে গেল আমার, শুধু বললাম, 'আসছি'।
কলকাতা থেকে গাড়ি ড্রাইভ করে চলেছি, নাহ আমাকে পৌঁছতেই হবে আমার মানসীর কাছে, একটিবার, জীবনে একটিবারও কি তার মুখ দেখতে পাবনা!!! খুব অসহায় ভাবে ছুটতে ছুটতে এলাম হাসপাতালে, বেশ কিছু আত্মীয়, প্রতিবেশীর জটলা। আমার হতবুদ্ধি, চঞ্চল আচরণে একটি শ্যামলা কিশোরী এগিয়ে এল, তারপর নিয়ে গেল একটি আই সি ইউ কেবিনের দিকে। দরজা ঠেলে কাছে এগোলাম, মাথার ব্যান্ডেজে আধঢাকা মুখ, অজস্র নল আর সূচ বেষ্ঠিত একটি শরীর, নিমীলিত চোখ। হাতটা যে ছুঁয়ে দেখব, তার কোন উপায় নেই, শুধু কানের কাছে মুখটা নিয়ে বললাম, 'ঝিঙেফুল, ঝিঙেফুল', চোখের তারাটা নড়ল কি!! ঠোঁটটা কাঁপল কি!! নাহ, আর দাঁড়াইনি, ছুটে পালিয়ে এসেছিলাম।
পরদিন অন্তিম খবরটা ঐ কিশোরীই দিয়েছিল, শুনেছিলাম আনমনে রাস্তা পার হতে গিয়ে একটা মাল বোঝাই লরিতে ধাক্কা লেগেছিল। সম্পর্কের লক্ষণরেখা যে নিজে মেনে চলেছিল, সে নিজেই ট্রাফিক নিয়মের লক্ষণরেখাটা কেমন করে যেন অতিক্রম করে ফেলেছিল। শুকিয়ে গেল আমার ঝিঙেফুল। এরপর আমি শারীরিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম, ডাক্তার মানসিক স্ট্রেসের কথা বললেও এ কথা কাউকে কোনদিন বলতে পারিনি। সব কিছু থেমে গিয়েছিল, একটা অক্ষরও আর আসত না হাতে, সবাই অভিমান করে বসল। ঘুম না আসা মধ্যরাতে ছাদে গিয়ে তারাদের দেশে একটা ঝিঙেফুল খুঁজতাম কেবল।
**********
দশটা বছর কেটে গেছে, সময়ের সরণীতে ক্ষততে প্রলেপ পড়েছে, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়েছে জীবন। চুলগুলো আজ শ্বেতশুভ্র, শুধুই কি আর বয়স!! অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়েছি ক্রমাগত। আজ বাইশে নভেম্বর। সোহেল রানার 'ঝিঙেফুল' সাহিত্য আ্যাকাডেমি পুরস্কার পেল। সারা দিন মঞ্চ আলো করা অনুষ্ঠানে, উপহারে কেটে গেল দিন। বড় আনন্দের দিনেও মনে বড় বিষাদ। ঝিঙেফুল আমায় শিখিয়ে দিয়েছিল কিভাবে পারিবারিক কক্ষপথে থেকে ভালবাসায় সিক্ত থাকতে হয়, সেই আমাকে প্রথম বলেছিল একটা আপ্তবোধ, 'ভালবাসা নিত্যতার সূত্র মেনে চলে'।
বলেছিল, ' আমায় ভালবাসলে ঘরের লোকের ভাগে কম পড়ে যাবে যে, সংসার করতে করতে কখনও মরচে পড়ে বইকি, তা নিজেরাই সরিয়ে ফেলতে হয়, সংসার যে একটা পবিত্র বন্ধনের জায়গা, গৃহীর জন্ম দেয়, সন্ন্যাসীর জন্ম দেয় আবার সৈনিকের ও জন্ম দেয়। সবাই যদি মনের টানে ভেসে যাই তবে ভেসে যাবে সংসার, সমাজ, সব কিছু। আমাদের পরের প্রজন্ম কে শেখানোর মত কিছু তো দিয়ে যেতে হবে। আমরা যে পথে এগোব, সেই পথেই একটা একটা করে পা রাখে আমাদের সন্তান। এগুলো আমাদের ঐতিহ্যের ভিত্তি। ঘরকে ভালবাসতে হবে, নিজেকে ভালবাসতে হবে'। আমার ঝিঙেফুল কেমন সহজ ভাবে জানিয়ে গেছে তার জীবনবোধ।
অকালে শুকিয়ে গিয়েও ভালবাসার মন্ত্রটি আমায় শিখিয়ে গেছে কানে কানে। আমিও এক সময় উদভ্রান্ত মনটিকে বশে এনেছি, খুঁজে পেয়েছি সুখী গৃহকোণটি। নতুন করে ভালবাসায় নিমজ্জিত হতে হতে মনের অন্তঃপুরে জীবিত রেখেছি ঝিঙেফুলটিকে, লিখে ফেলেছি নতুন কাব্যগ্রন্থ, 'ঝিঙেফুল'।

Comments
Post a Comment