মৃত্যু হলেই বেশি ভালো হয়
মৃত্যু হলেই বেশি ভালো হয়
আবদুস সাত্তার বিশ্বাস
আমিরুল ও কামিরুল দুই ভাই।আমিরুল বড় আর কামিরুল হল ছোট ভাই।পাড়ায় এই দুই ভাইয়ের সমান জমি আর কারও নেই।কারণ এদের বাপ-দাদারা যে আগে থেকেই বড়লোক এবং বেশি জমির মালিক ছিলেন।বাবুদের গোমস্তাগিরি করে তাঁরা বেশি জমি করেছিলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে তাই এরাও বড়লোক এবং বেশি জমির মালিক।একেক ভাইয়ের তিরিশ বিঘা করে।আজকাল সেটা বেশি জমির মধ্যেই পড়ে।এক ভাই তাই আরেক ভাইয়ের চাইতে কোন অংশেই কম নয়।তবুও আমিরুল সমাজে মানুষের সঙ্গে চলাফেরার দিক থেকে এক ধাপ এগিয়ে রয়েছে।কারণ পাঁচ জায়গায় সে ওঠাবসা করে।কেননা সে হল একজন পাক্কা পরহেজগার মানুষ।নিয়ম করে পাঁচ অক্ত নামাজ পড়ে,রোজা রাখে এবং কোরান পড়া জানে।ধর্ম সম্পর্কে তার টনটনে জ্ঞান আছে।মানুষকে সে ভালো বোঝাতেও পারে।যেকারণে তাকে দেখে কেউ একজন মৌলবি সাহেব মানুষ ছাড়া বলতেই পারবে না,বলবার কারো শক্তিও নেই।গ্রামের মসজিদে ইমাম সাহেব যখন থাকেন না সে-ই যে নামাজ পড়িয়ে দেয়।স্বভাবত কারণে সমাজে সে মান্যতা পায় একটু বেশি এবং পরিচিতির দিক থেকেও কম নয়।কিন্তু ছোটভাই কামিরুল এসবের ধার ধারে না বলে সে অত পরিচিত নয়।আবার মান্যতাও খুব বেশি পায়না সে সমাজে।তবু এ নিয়ে তার মনে কোন খেদ-দুঃখ বা রাগ-হিংসা কোনটাই নেই।কারণ সে তার মতো থাকতেই বেশি পছন্দ করে।ফলে ভাইয়ে ভাইয়ে তাদের কোনদিন কাজিয়া ঝামেলা নেই।
যাইহোক,এটা কি মাস চলছে যেন?হ্যাঁ,ভাদ্র মাস।এখনই তো মাঠে পাট কাটার সময়।দুই ভাই তাই নিজ নিজ মুনিশ নিয়ে মাঠে পাট কাটতে যায়।দুই ভাইয়ের যেহেতু পাশাপাশি জমি তাই একসাথেই যায়।জমির মাঝখানে শুধু একটা আল দেওয়া আছে।অর্থাৎ জমি ভাগ করার সময় দুই ভাই মিলে আলটা দিয়ে রেখেছে।যাতে ভবিষ্যতে দুই ভাইয়ের মধ্যে জমি ঠেলাঠেলি না হয় বা এই নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে কোন দ্বন্দ বা মনোমালিন্য না হয়।তার আগে যদিও এটা একটাই জমি ছিল।কিন্তু ভাগ হয়ে যাওয়ার পর এখন পৃথক পৃথকভাবে চাষ করলেও দুই ভাইয়ের এখানে একটা জিনিস দেখে খুব ভালো লাগে সেটা হল,জমি চাষ করে ফসল বোনার সময়ও দুই ভাই একসাথে বোনে এবং সেচ সার ও বিষ স্প্রে করার সময়ও দুই ভাই একসাথে করে।আবার ফসল কাটা মাড়ার সময়ও দুই ভাই একসাথে।তাই মুনিশ নিয়ে যাওয়ার সময়ও দুই ভাই একসাথে যায় এবং জমিতে একসাথে পাট কাটতে শুরু করে।পাট কাটতে কাটতে কামিরুলের একটা মুনিশ কুতুবুদ্দিন তার নাম।সে পাট কাটা ছেড়ে হঠাৎ বসে পড়ে।তার বসে পড়া দেখে কামিরুল তাকে জিজ্ঞেস করে,"কি হল রে,বসে পড়লি কেন?"
কুতুবুদ্দিন বলে,"খুব পিপাসা লেগেছে তাই একটু বসলাম।"
শুনে কামিরুল বলে,"এই তো ঘণ্টা দুয়েকও হল না বাড়ি থেকে আসা।এখনো বেলা দশটা বাজে নি।আর এরই মধ্যে তোর পিপাসা লেগে গেল?আশ্চর্য!আসার সময় কি বেশি করে পানি খেয়ে আসিস নি নাকি?"
কুতুবুদ্দিন বলে,"আসবো না কেন,এসেছি।"
"তা-ও পিপাসা লেগে গেল?"
"লেগে গেল তো আমি কি করবো?"
"তাইতো।তুই আর কি করবি?"
কুতুবুদ্দিন তখন বলে,"আমি পানি খেয়ে আসবো?"
কামিরুল বলে,"কোথা থেকে পানি খেয়ে আসবি?"
কুতুবুদ্দিন বলে,"ওই দূরে একটা মেশিন চলছে ওখান থেকে।খেয়ে আসবো?"
কামিরুল কিছু না বলে এবার চুপ করে থাকলে কুতুবুদ্দিন ফের বলে,"কি হল বলো,খেয়ে আসবো?"
কামিরুল কুতুবুদ্দিনকে তখন যা বলে তা হল,"কাজ কামাই করে অতদূরে এখন পানি খেতে যাবি?তার থেকে আর একটু ধৈর্য্য ধর না,একটু পরই তো খাবার আনতে যাবো।খাবার খেয়ে তখন নাহয় একবারেই পেট ভরে পানি খাবি।"
কিন্তু কুতুবুদ্দিন তার উত্তরে তখন বলে যে,তার এত পিপাসা লেগেছে যে তার ধৈর্য্য ধরার মতো কোন ক্ষমতা নেই।মুখ শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে।তাকে এক্ষুনি পানি খেতেই হবে।নাহলে সে কাজ করতে তো পারবেই না বরং মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।
তাহলে তো আরো মুশকিল!অতএব কামিরুল তাকে বলে,"মাঠে আসার সময় বড় ভাই এক ঘটি পানি এনে রেখেছে আমি দেখেছি।সুতরাং ওই পানি খেয়ে তুই এখনকার মতো পিপাসা মিটাতে পারিস।"
"কোথায় এনে রেখেছে?"কুতুবুদ্দিন জিজ্ঞেস করে জানতে চাইলে কামিরুল তাকে হাত দিয়ে দেখিয়ে দেয়,"দ্যাখ,ওই আলে রেখেছে।"
কুতুবুদ্দিন তার দেখানো আলের দিকে তাকিয়ে ঘটিটা তখন দেখতে পেয়ে তাকে জিজ্ঞেস করে,"খেলে বকবে না তো?"
আমিরুল বলে,"পানি খাওয়ার জন্য কোন মানুষ কোন মানুষকে কোনদিন বকেছে শুনেছিস?"
কুতুবুদ্দিন বলে,"না,তা শুনিনি।"
"তাহলে বলছিস যে?যা চট করে খেয়ে চলে আয়।"
কুতুবুদ্দিন এরপর ওই ঘটিটার কাছে যায়।গিয়ে দেখে ঘটিটা গামছা দিয়ে ঢাকা রয়েছে।সে তখন গামছাটা ধীরে ধীরে উদোম করে এক ঘটি পরিষ্কার জল দেখে থামতে না পেরে ঘটিটা সে হাতের তালুর উপর টপ করে তুলে নেয় এবং উঁচু করে মুখে ঢালতে যাবে অমনি আমিরুল দেখে ফেলে চিৎকার করে উঠে,"আমার ঘটির পানি পান করবি না,খবরদার!....আমার ঘটির পানি পান করবি না।..."
কিন্তু কুতুবুদ্দিনের পিপাসা আর সহ্য হয়না।সে তাই ও কথায় কান না করে মুখে জল ঢালতে শুরু করে দেয় এবং সেই জল ঢকঢক করে গিলে নেয়।
এরপর আমিরুল দৌড়ে এসে তাকে ধরে ফেলে বলে,"এই শালা শুয়োরের বাচ্চা বল,তুই আমার ঘটির পানি পান করলি যে?পান করলি যে বল।..."ভীষণ ভাবে সে চেপে ধরে তাকে।
কুতুবুদ্দিন খুব শান্ত স্বরে বলে,"খুব পিপাসা লেগেছিল তাই একটু পানি খেলাম,বেশি খাইনি।বিশ্বাস নাহয় আপনি তাকিয়ে দেখেন!তাছাড়া মুখ ঠেকিয়ে খাই নি।ঘটি উঁচু করে খেয়েছি।"
আমিরুল শুনে না।সে তাকে আরো আরো চেপে ধরে এবং যা তা ভাষায় বকে চলে।
নিরুপায় কুতুবুদ্দিন তখন বলে,"আমার ভুল হয়ে গেছে।আমি বুঝতে পারিনি যে একটু পানি খাওয়ার জন্য আপনি---- যাইহোক,আপনার ঘটিটা আমাকে দিন আমি এক্ষুনি এক ঘটি টাটকা পানি আপনাকে এনে দিচ্ছি।"
আমিরুল অমনি মুখ ভেংচিয়ে খিস্তি মারতে শুরু করে,"এই শালা,তুই নামাজ পড়িস,যে তোর এনে দেওয়া পানি আমি গ্রহণ করবো?মুতে পানি নিস?তাছাড়া পানি এনে দেওয়ার যখন তোর অতই শখ তখন এনে খেলেই পারতিস,খেলি না যে?বল,খেলি না যে?"
ভীষণ লজ্জা আর অপমানে কুতুবুদ্দিনের মুখটা ম্লান হয়ে যায়।সে এর কি উত্তর দিবে খুঁজে না পেয়ে তখন নত মুখে চুপ করে শুধু দাঁড়িয়ে থাকে।তার মুখ পানে তাকাতে পারেনা।আর ওই সুযোগে আমিরুল তার হাতের হেঁসোটা কুতুবুদ্দিনের মাথায় বসিয়ে দেয়।এরপর হাসপাতালে গিয়ে সে মারা গেলে পরে আমিরুল খুনের আসামি হয়ে বাড়ি থেকে পলাতক হয়ে যায়।কারণ পুলিশ পেলেই যে তাকে ধরবে।...
পুনশ্চঃমুখোশের আড়ালে এরকম আর কত মানুষ দেখবো,হায়!এত এত ধর্ম পালন করেও এদের বিবেক জাগ্রত হয় না!বুকের মধ্যে অমানবিক চিন্তা নিয়েই শুধু ঘুরে বেড়ায়।সুতরাং এইসব উন্মত্ত বেকুবদের মৃত্যু হলেই বেশি ভালো হয়।মৃত্যু হলেই বেশি-----

Comments
Post a Comment