গল্প- শিক্ষাই পরিচয়
গল্প- শিক্ষাই পরিচয়
সুমিতা চৌধুরী
মেট্রো স্টেশনে নামতে গিয়েই খুব জোরে ধাক্কা খেল জিৎ! হাতের সব কাগজপত্র পড়ে গেল প্ল্যাটফর্মে। মুখ তুলে দেখল, তার পরিচিত সেই মুখ, যে বেশ কিছুকাল হলো স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে গেছে সেই তীব্র অপমানিত হওয়ার পর থেকে। সজল ডাগর দুটি চোখে যেন নিঃস্বার্থ ক্ষমার আকুতি। জিৎ মনে মনে বুঝতে পারল নিজেকে না দেখতে দিতে ও তাকে এড়াতেই এমনটা ঘটিয়ে ফেলেছে নয়না। তড়িঘড়ি অফিসের কাগজপত্রগুলো কুড়িয়ে নিয়েই জিৎ নয়নার পথ একরকম প্রায় আগলেই দাঁড়াল। " দাঁড়াও, প্লিজ যেও না আমার কথা না শুনে আজ। জানি, হয়তো একথা বলার অধিকার হারিয়েছি আজ তোমার মনের কাছে। তবু কিছু কথা তোমার জানা দরকার। সেদিন আমার বাড়িতে আমার পরিবারের হাতে তোমার চরম অপমান মা চেষ্টা করেও আটকাতে পারেনি, আমিও না। তার জন্য শুধু আমি নয়, মাও মর্মে মরে আছে। পরদিন মা একান্তে আমায় বলেছিল, " বাবু, মানুষের পরিচয় তার জন্ম দিয়ে হয় না, শিক্ষা দিয়ে হয়। শিক্ষাই প্রতিটা মানুষের একমাত্র মাপকাঠি। তাই মালতীর মেয়েকে মন থেকে বউমা বলে মেনে নিতে আমি এতোটুকুও দ্বিধান্বিত বা কুণ্ঠিত নই। বাকী সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণরূপে তোমার। কারণ বিয়েটা তুমি করবে, অন্য কেউ নয় আর জীবনটাও তোমাদের দু'জনের, অন্য কারো নয়। তুমি যদি ওর সমস্ত দায়িত্ব, বিশেষত সম্মান রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে বিয়ে করতে চাও, তবে আমি সবার বিরুদ্ধে গিয়েও তোমাদের পাশে আছি, থাকবো। তাতে যদি তোমাদের আলাদা থাকার সিদ্ধান্তও নিতে হয়, সম্মান রক্ষার্থে, তবে আমার তাতেও পূর্ণ সায় থাকবে। আমার কথা আমি বললাম, তুমি যথেষ্ট পরিণত, বাকীটা তাই তুমি ঠিক করবে। আমি তোমায় কোনোদিন ফাস্ট, সেকেণ্ড হওয়ার জন্য পড়াশুনা করাইনি। করেছিলাম প্রকৃত শিক্ষিত হওয়ার জন্য। জানি না কতোটুকু শিক্ষা দিতে পেরেছি। সেটা সময়ই প্রমাণ দেবে। শুধু এইটুকুই বলবো, শিক্ষা মানুষকে উদার করে, সংকীর্ণ নয়।" আমি অনেক খুঁজেছিলাম তোদের, অনেককে জিজ্ঞেসও করেছিলাম তোরা কোথায় গেছিস, নতুন বাড়ির ঠিকানাও জানতে চেয়েছিলাম সবার কাছে, কিন্তু তোর কথাতেই হয়তো কেউ কিছু বলেনি। জানি তোর জায়গায় যে কেউ থাকলেই এটাই করতো, অস্বাভাবিক একটুও নয়। শুধু ভাগ্যের জোরে আজ যখন দেখা হয়ে গেছে তখন বলতে চাই, আমিও আমার মায়ের সাথে একমত। আমি নিজেও জানি না কতোটুকু শিক্ষিত হতে পেরেছি আমি, তবে তোর জন্মপরিচয় না জানার সময়ও তোকে যতোটা ভালোবেসেছি, আমার জীবনে তোর প্রাধান্য যতোটা ছিল, তুই নিজে মুখে সবটা জানানোর পরও তা এতোটুকু বদলায়নি, আর আজও তা একই আছে। তাই সামনের রবিবার আমি আর আমার মা তোদের বাড়ি যাবো, তোর মায়ের থেকে অনুমতি আর আশীর্বাদ নিতে। জানি না উনি আমায় যোগ্য মানবেন কিনা আর, বা বিশ্বাস, ভরসা করতে পারবেন কিনা, বা তুই মানবি কিনা আমায়, তাও জানি না আমি। তবু ঠিকানাটা আজ দয়া করে দে। আমরা একবার অন্তত যেতে চাই আমাদের প্রার্থনা নিয়ে তোদের কাছে আর ক্ষমা চাইতেও। মা কখন বাড়ি থাকবেন বল, আমরা তখনই যাবো। প্লিজ নয়না..." নয়না এতক্ষণ নিরবে তার শান্ত স্বভাবে সবটা শুনে, খুব শান্ত কিন্তু দৃপ্তস্বরে বললো,"তোমায় আমি মন থেকে চিনি, জানি, বিশ্বাস করি আজও। তোমার কথায় তোমার মাকেও চিনেছিলাম অনেকটা। বাকীটুকু চিনেছি সেইদিন। আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। দাবীও নয়। তাই, আর নিজেদের সবকিছুর জন্য দায়ী করে কষ্ট পেও না তোমরা। ক্ষমা চাওয়াও তাই নিষ্প্রয়োজন। আমরা নিমতার নতুন ফ্ল্যাটে উঠে যেতামই কিছুদিন পর, সেটা একটু এগিয়ে গিয়েছিল এই যা। তাতে ভালো বই মন্দ কিছু হয়নি। আর শিক্ষা, রুচি বা মতামত যার যার কাছে। তবে এই সমাজে মেয়েদের বিয়ের পর পরিবার ছাড়তে হয়, ছেলেদের নয়। আর আমি চাই না আবেগের বশে বা কথা রাখার জন্য তুমি তোমার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হও। তাই সিদ্ধান্তটা আবারও খুব ভেবেচিন্তে নিও, তাড়াহুড়োতে নয়। আমার মনে তোমার যে স্থান, আজীবন তাই থাকবে। তবে সেটা দাবী করতে কোনোদিন যাবো না। তাই আমায় নিয়ে নিঃসংশয় থাকতে পারো। তবে এটুকু বলতে পারি কোনো প্রতিশোধস্পৃহা বা রাগ কোনোটাই নেই আমাদের তোমাদের প্রতি। তাই বাড়িতে আসতেই পারো, অসম্মানিত হবে না, এটুকু বলতে পারি। আর আমার মা লেখাপড়া না তেমন জানলেও মানসিকতায় উদার, যাকে তোমরা প্রকৃত শিক্ষিত বলছো। তাই আমার কোনো কাজে আমায় বাধা দেননি,ভবিষ্যতেও দেবেন না। আমার মতকেই সাদরে গ্রহণ করে পূর্ণ সমর্থন করবেন। আর হ্যাঁ, আমি চাকরি পাওয়ার পর থেকে মাকে অবসর নিতে বলেছি। তাই মা এখন অবসরকালীন জীবন কাটান নিজের সংসারে। তাই বাড়িতে যে কোনো সময়ই আসতে পারো তোমরা। রবিবার আমারও ছুটির দিন, তাই কোনো অসুবিধা হবে না।
আমি এইসব কথাগুলো সেদিন তোমাদের সবার সামনে বলতেই পারতাম। কারণ মায়ের পরিচারিকা হওয়াতে আমার কোনো লজ্জা নেই বরং গর্ব আছে। মা পরিশ্রমের উপার্জনে আমাকে নিজে শতো কষ্ট করেও লেখাপড়া শিখিয়ে বড়ো করেছেন,শিক্ষিত করার কোনো চেষ্টায় কোনো খামতি রাখেননি শত প্রতিকূলতা স্বত্তেও। শুধু তোমার আর তোমার মায়ের সম্মান আর ভালোবাসার কথা ভেবে কিছু বলতে পারিনি সেদিন। আর কথা বাড়িয়ে তোমাদের অপমানিত করতে চাইনি, তাই চলে এসেছিলাম। তবে শেষবার বলছি, ঝোঁকের বশে কোনো সিদ্ধান্ত নিও না যাতে পরে আক্ষেপ করতে হয়। আমিও জানি না আমি কতোটা শিক্ষিত হতে পেরেছি, তবে তোমার মন থেকে নেওয়া যে কোনো সিদ্ধান্তে আমি মন থেকে তোমার পাশেই থাকবো আজীবন, কোনোরকম দোষারোপ না করে, পরিস্থিতি বুঝেই, এটুকু বলতে পারি।" ছোট্ট একটা চিরকুটে ঠিকানা লিখে দিয়ে স্বভাবসুলভ মিষ্টি হাসিতে বিদায় জানিয়ে চলে গেল নয়না। জিৎ মনে মনে ভাবল, তার পরিবেশে শিক্ষার উদারতায় সে যতোটা এগিয়ে, তার থেকে অনেকটাই এগিয়ে শিক্ষায় ও উদারতায় নয়না, প্রতিকূল পরিবেশে থেকেও। মা ঠিকই বলে, প্রকৃত শিক্ষাই মানুষের একমাত্র পরিচয় ও মাপকাঠি। আজ অনেকদিন পর হালকা মনে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে তার। বাড়ি ফিরে সবটা যে মাকে জানাতেই হবে......

Comments
Post a Comment