মানুষ এসবের মালিক নয়
আবদুস সাত্তার বিশ্বাস
অনেকক্ষণ আগে হিসি লাগলেও হিসি করেনি রহিদুল।ফাঁকা রাস্তায় এসে তাই সে একটা ঝোপের ধারে টপ করে সাইকেল রেখে দাঁড়িয়ে গেল।ও হিসি সেরে সাইকেলের কাছে এসে দেখল যে,ঝুল পাঞ্জাবি পরিহিত একজন মানুষ তার সাইকেলের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।রহিদুলকে তিনি কিছু বলতে চান।সেটা বুঝতে পেরে রহিদুল সেই ব্যক্তিকে নিজে থেকেই জিজ্ঞেস করল,"কি ব্যাপার চাচাজি,দাঁড়িয়ে কেন?কিছু বলবেন নাকি?"
"হ্যাঁ।তোমার সঙ্গে আমার কিছু দরকার আছে।"
"কিন্তু আপনি কে আমি চিনতে পারলাম না যে আপনাকে।"
"আমার বাড়ি সামনে কিছুটা গিয়ে উদয়পুর গ্রামে।আমার নাম হাজি মহাম্মদ মতিউর আলি সাহেব।"
রহিদুল বলল,"বেশ,কি দরকার বলুন!"
উনি তখন তাঁর সাইকেল থেকে নেমে সাইকেল স্ট্যান্ড করে রহিদুলকে বললেন,"তোমাকে দেখে কিন্তু মুসলমান বলে মনে হচ্ছে।তোমার নাম কি?"
রহিদুল নাম বলতে কোনো দ্বিধা করল না।সঙ্গে সঙ্গে সে নাম বলে দিল,"আমার নাম রহিদুল সেখ।"
"আমি যেটা ভেবেছিলাম সেটাই।তুমি মুসলমান।"
"হ্যাঁ,আমি মুসলমান।"
"কিন্তু বেটা,মুসলমানদের ধর্মে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করা যে নিষেধ আছে।তবু তুমি দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করলে!"
"আমার ভুল হয়ে গেছে,চাচাজি।আসলে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করতে বেশি সুবিধা বলে দাঁড়িয়েই পেচ্ছাব করি।"
"ভুল করো।আর কোনোদিন করোনা।কঠিন পাপ।দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করে হিন্দুরা।অমুসলিম বেদিনরা।যাদের ধর্মে পাপ পুণ্য বলে কিছু নেই।কিন্তু মুসলমানরা দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করেনা।"
রহিদুলের মনের ভিতর তখন আলোচনা হল,সমাজে কত রকমের মানুষ রয়েছে।তার মধ্যে কতজন কত রকম অন্যায় কাজ করে।যার কোনো ক্ষমা হয়না।অথচ তাতে তাদের কোনো পাপ হয়না।আর সে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করেছে বলে তার কঠিন পাপ হবে।এটা কোনো যুক্তির কথা হল?পেচ্ছাব করাটা মানুষের একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার।কে কিভাবে পেচ্ছাব করবে না করবে সেটা তার ব্যাপার।যদি কারও দাঁড়িয়ে সুবিধা হয় তো সে দাঁড়িয়ে করবে।যদি কারও বসে সুবিধা হয় তো সে বসে করবে।এখানে জাত ধর্ম আসছে কোত্থেকে?না আসাই উচিত বলে সে মনে করে।নিশ্চয় এটা উনার মনগড়া কথা।বানিয়ে বানিয়ে বলছেন।কিন্তু এর উত্তর দিতে গেলে উনি যদি রেগে যান বা মনে কষ্ট পান এই ভেবে সে চুপ করে থাকল।যতই হোক উনি বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ!
এরপর উনি রহিদুলকে দোয়া জানে কিনা জিজ্ঞেস করলেন।
রহিদুল বলল,"দোয়া!দোয়া তো অনেক আছে।কোন দোয়া জানার কথা বলছেন?"
"কেন,পেচ্ছাবের দোয়া।জানো?"
রহিদুল অবাক হল,"পেচ্ছাবের আবার দোয়া হয় নাকি!"
"তো হয় না?"
"হয় সেটা জানতাম না তো।"
"আজ তো জানলে।এবার বাড়ি গিয়ে একটা বই কিনে দোয়াটা মুখস্থ করে নিও।নাহলে জীবনে তো প্রচুর পাপ করেছ আরো পাপ বাড়বে।পাপে পাপে তুমি একেবারে শেষ হয়ে যাবে।মরণের পরে কঠিন শাস্তি হবে।দোজখের আগুনে পুড়তে হবে।শুধু পেচ্ছাবের নয়,আরো অনেক কিছুর দোয়া আছে।পায়খানার দোয়া আছে।গোসলের দোয়া আছে।এক কথায়,মনুষ্য জীবনের প্রতিটি কাজের দোয়া আছে।সব গুলো পড়লে তোমার জীবনে পাপ তো থাকবেই না।জীবনে অনেক অনেক লাভবান হবে।প্রচুর নেকি কামাই করতে পারবে।যাইহোক,পেচ্ছাব করে পানি নিয়েছ তো?"
এদিক ওদিক তাকিয়ে ওটা কোথাও দেখতে না পেয়ে রহিদুল বলল,"এখানে পানি কোথায় যে পানি নেবো?"
উনি বললেন,"ঢিল তো রয়েছে।ঢিল নিয়েছ?"
রহিদুল ঢিলও নেয়নি শুনে উনি এবার ভীষণ ভাবে রেগে গিয়ে বললেন,"....তুমি একটা কাফেরের চাইতেও নিকৃষ্ট।এবং অধমের চাইতেও অধম।মরে গেলে তোমার জানাযা পড়াই উচিত নয়।কুকুর,বেড়ালের মতো চাপা মাটি দেওয়া উচিত।তোমার মতো কাফের রহিদুলদের জন্যই আজ দুনিয়ার মুসলমানদের এই হাল।বিশ্ব জুড়ে মার খাচ্ছে মুসলমানরা।আমি বাদশা হলে তোমার মতো রহিদুলদের আগে কচু কাটা করতাম।খোদার কসম খেয়ে বলছি,কচু কাটা করতামই।....তারপর অন্য কাজে হাত দিতাম।"
অমনি কোথা থেকে দুটো বাচ্চা ছেলে চলে এসে তাদের কাছে হাত পেতে দাঁড়ালো।কিছু পয়সা সাহায্য চাইল বাচ্চা দুটো।কারণ তারা সেই পয়সা দিয়ে কিছু খাবার কিনে খাবে।তারা দুই ভাই।তাদের মা-বাবা নেই।লোকের কাছে এইভাবে চেয়ে চেয়ে খেয়ে তারা বেঁচে আছে।
মেদ বর্জিত বাচ্চা দুটোর রুগ্ন হাতে রহিদুল তখন কিছু না দিয়ে থাকতে পারল না।পকেট থেকে দশটা দশটা বিশটা টাকা বের করে তাদের দুই ভাইয়ের হাতে ভাগ করে দিল।
কিন্তু ঝুল পাঞ্জাবির পকেট থেকে উনার একটা টাকাও বের হল না।বরং বাচ্চা দুটোকে লাথি মেরে ফেলে দিয়ে উনি,"শালারা তোদের বাপ কি পয়সা করে রেখে গেছে যে তোদের পয়সা দেব!...."এই কথা বলতে বলতে সাইকেলে চেপে চলে গেলেন।
রহিদুল তখন তাড়াতাড়ি করে বাচ্চা দুটোকে ধরে তুললে বাচ্চা দুটো তাকে বলল,"আপনি খুব ভালো মানুষ।আর উনি একটা পচা মানুষ।"
রহিদুলের তখন মনে হল,প্রকৃত ধর্ম মানুষের অন্য কিছুতে নেই।মানুষ যেটা জাহির করে বেড়ায় সেটা তার ভড়ং মাত্র।প্রকৃত ধর্ম আছে মানুষের মনে।মানব প্রেম তার একমাত্র প্রমাণ।অতএব জান্নাতে কে যাবে আর কে জাহান্নামে যাবে সেটা বিচার করার মালিক উনি নন।বিচার করবেন তিনি।উপর থেকে যিনি সব দেখছেন।এবং সব শুনছেন।মানুষ এসবের মালিক নয়।
----সমাপ্ত----

Comments
Post a Comment