একটা_তুষারঝড়_পেরিয়ে

 একটা_তুষারঝড়_পেরিয়ে

  ---------®সুপ্তোত্থিতা_সাথী


           কলেজ ক্যান্টিনে অধৈর্য্য হয়ে এক কোণে বেঞ্চে বসে, জিয়ন। ধুমপান দন্ডে পর পর কয়েকটা টান মেরে পায়ের তলায় আচ্ছাসে তাকে এমনভাবে পিষে  দিল যেন বিরক্তির টুঁটি চেপে তাকে খতম করে দেওয়া হলো।
-'ধ্যাত! কলেজেও কেউ যে এমন সিরিয়াসলি পড়তে শুনতে আসে,তা এই মেয়েটাকে দেখে এদ্দিনে বিশ্বাস হল আমার।
আরে স্টুডিয়াস হ আর মেরিটোরিয়াস,তা বলে কি প্রেম-ট্রেম করতে নেই! কোন বইতে এমনটা লেখা টেখা আছে শুনি! প্রশ্ন করলেই তো মেয়ে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে।সেই থেকে রুহির জন্য ওয়েট করতে করতে পস্টেরিয়ারের নার্ভাস সিস্টেমে জ্যাম লেগে যাবার উপক্রম,তবু দেবীর অবতরণের সময় হল না এখনো।'
জিয়ন,বিড়বিড় করে যেতে লাগলো আপন মনে।
শশব্যস্ত ভাবে ক্যান্টিনের বাকি সবাইকে পাশ কাটিয়ে, জিয়নের বেঞ্চের উপর হাতের ডায়েরি আর পেনটা ধপ করে রেখে,'উফ' শব্দে রুহি বুঝিয়ে দিল যে ক্লাস সেরে,বন্ধুদের উপেক্ষা করে, জিয়নের কাছে আসতে তাকে বেশ ঘাম ঝরাতে হয়েছে।রুহির হাতটা ধরে পাশে বসিয়ে জিয়ন অপলক দৃষ্টিতে দেখেই চলেছে তাকে।রোজই তো সে রুহিকে খুব কাছ থেকে দেখে।কিন্তু সেই দেখার কেন যে শেষ হয় না,তার কারণটা থার্ড ইয়ারে এসেও জিয়নের বুঝে ওঠা হয় না।কলেজের ফ্রেশারের দিন থেকে রুহিকে যেমনটা দেখেছিল জিয়ন,আজও ঠিক সেই প্রথম দিনের মতই রুহি আটকে আছে তার চোখের ফ্রেমে।প্রায় প্রতিদিনই তাদের মধ্যেকার সম্পর্কের একবার করে অকাল মৃত্যু ঘটে,আবার জিয়নকাঠির ছোঁয়ায় তা রোজই বেঁচে ওঠে।তবু জিয়নের কাছে রুহি একবারের জন্যও অপ্রিয় হয় না।
   
         মহাশূণ্য থেকে যেনো একটা উল্কাপিন্ড ধেয়ে এসে সজোরে ভূপতিত হবার আগেই, হাওয়ায় গা ভাসিয়ে  থিতু হল জিয়নের মাথায়।তার ঠিক পরেই উল্কাপিন্ড থুড়ি উড়ন্ত চাটির মালকিনের বক্তব্য-
-"এই,এই জিয়ন!মেয়ে দেখিসনি কখনো আগে? রোজই তো দেখিস আমায়,আর রোজই পজ মোডে চলে যাস আমায় দেখে।কেন বল তো!
তুই কি কখনো সিরিয়াস হতে পারিস না?নাকি তোর  নার্ভাস ব্রেক ডাউনের টেন্ডেন্সি আছে?"
নিজের মাথায় খানিক হাত বোলাতে বোলাতে একটু লাজুক ভাবেই ঢোকটা গিলে নেয় জিয়ন।তারপর লজ্জা ঢাকতে একগাল ক্যাবলা হাসি হেসে- 
-"ধুর! কি যে বলিস রুহি! এতই যদি ভাবুক হতাম,তবে কবেই আমি কবি হতাম,আর তোকে নিয়ে কাব্যি করে,তোর চলার পথে,দেওয়ালে, পোষ্টে সেই কবিতা সাঁটিয়ে দিয়ে মজাও নিতাম।
নে চল,চল,যে কারণে তোকে আজ তলব করা,সেই কথাটা পাড়া যাক এখন,কি বলিস!"

        আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই হুজুগে বাঙালীর গালভরা ভালোবাসার দিন, মানে  যার পোষাকি নাম- "ভ্যালেন্টাইন ডে"-তারই আসার প্রস্তুতিপর্ব চলছে।তাই চারিদিকে ভালোবাসার পার্থিব সম্ভার সাজিয়ে, বিজনেস পলিসিতে মুনাফা লোটার তোড়জোড় চালাচ্ছে কিছু সুবিধাবাদী লোক আর রঙীন ভালোবাসায় হাবুডুবু খেয়ে মুনাফা লোটা লোকের কাছে বিকিয়েও যাচ্ছে বোকা প্রেমিক-প্রেমিকার দল।যদিও রুহি বা জিয়নের কাছে ভালোবাসার জন্য কোন বিশেষ দিন হয় না।তবুও নিজেদের জীবনে ভালোবাসাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য,একটা কিছু নতুন রেজোলিউশন নেওয়াই যায়-এই লজিকে তারা দুজনেই বিশ্বাসী।ক্যান্টিনে বসে সেই কথাটাই এবার  পাড়লো জিয়ন।রুহিও মাথা নেড়ে,মুচকি হেসে  তাতে সায় দিলো।কিন্তু ব্যাপারটার মধ্যে একটু অন্যরকম স্বাদ  আনার জন্য রুহি একটা শর্ত রাখলো।শর্ত অনুযায়ী ভ্যালেন্টাইন ডের আগে কেউ কারো মুখোমুখি হলেও মুখে 'রা'-টি কাড়বে না।বড়ো জোর এড়িয়ে যাওয়া যাবে।যে রেজোলিউশনটি টেক করা হবে,সেটি ব্রেনের হার্ড ডিস্কে স্টোরড থাকবে।আর সেই বিশেষ দিনে,একটা নির্দিষ্ট জায়গায়,রেজোলিউশনে সফল হয়ে, দুজন আবার মুখোমুখি এসে দাঁড়াবে।যাতে নিজেরাই নিজেদের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে  ভালোবাসাকে আত্মস্থ করতে পারে।

শর্ত শুনেই জিয়ন গাইগুঁই শুরু করে দিয়েছিল প্রায়।তীব্র প্রতিবাদী মন নিয়ে রুহির কাছে আপিলও করেছিল।কিন্তু সিরিয়াস টাইপ রুহির ধমকানিতে সে আপিল গোঁত্তা খেয়ে লাট পাকিয়ে গেল।অগত্যা- লেজ গুঁটিয়ে কুইকুই করে, ঠোঁট উলটে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও সম্মতির লক্ষণ হিসেবে ঘাড়টা এমন করে ঘোরালো যেন ঘড়িতে  "ছ'টা বেজে পাঁচ" হয়ে রয়েছে। রুহি,জিয়নের এহেনো অদ্ভুত আচরণে কটমট করে খানিক ওর দিকে তাকিয়ে, ডায়েরি আর পেনটাকে প্রায় ছোঁ মেরে উঠিয়ে নিয়ে আবার আগের মতই শশব্যস্ত হয়ে, সবার পাশ কাটিয়ে, সায়েন্স কম্পাউন্ডের করিডোর ধরে এগিয়ে চলে গেলো।আর ঠিক আগের মতই স্পেলবাউন্ড জিয়ন ক্যান্টিনের খোলা জানলা দিয়ে মায়ামাখা রুহির ছায়াশরীরকে চোখের সামনে থেকে নড়ে চড়ে দূ-রে-আরও দূরে সরে যেতে দেখে চললো।

            নেক্সট ডে।সকাল এগারোটা বেজে পাঁচ।কলেজের সায়েন্স কম্পাউন্ডের ঢোকার মুখে ফেব্রুয়ারীর স্টোল জড়ানো মোলায়েম রোদে গা সেঁকে নিয়ে,অনেকেই দাঁড়িয়ে অলস গল্পে মশগুল।রুহিও দাঁড়িয়ে আছে জটলার মধ্যেই।তবুও ভীড়ের মধ্যেও যেন একটা খাঁ খাঁ করা আনচান ভাব টের পাচ্ছে ও।কখনো হাতে রাখা ফোনে হোয়াটস্যাপ মেসেজ বক্স চেক করছে,কখনো রিস্টওয়াচের কাঁটার নড়াচড়া ওয়াচ করছে,আবার কখনো বা বিশেষ কাউকে না দেখতে পাওয়ার উচাটনে বিরক্তিসূচক ভ্রুকুটিও করছে।

-'ধুর!ধুর!কি কুক্ষণে যে জিয়নকে জব্দ করার জন্য গর্ত খুঁড়তে গেলাম! নাও, এখন ঠ্যালা সামলাও।অন্যের জন্য গর্ত খুঁড়লে, নিজেকেই যে সেই গর্তে একদিন পড়তে হয়,তার প্রমাণ আমি হাতে নাতে পাচ্ছি।হে ভগবান! এইবারটি কোন ক্রমে উতরে দাও,এরপর এমন মন্দবুদ্ধি আর জীবনে অ্যাপ্লাই করবো না আর কক্ষণো।'
স্বগতোক্তির পর কলেজ গেটে বার কয়েক চোখ বুলিয়ে আবার হো- অ্যাপ চেক করতে গিয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়লো রুহি।
-"এক্সকিউজ মি!"

 রুহি হো অ্যাপ থেকে চোখ ওঠাতেই,সামনে রে-ব্যানের গগলস আঁটা, সুপুরুষ জিয়নকে খুব সিরিয়াস হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলো।রুহি এমন রূপ দেখেনি আগে জিয়নের।দ্বিতীয়বার 
-"এক্সকিউজ মি!" বলে পাশ কাটিয়ে, সামনের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের দিকে,ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে গেল জিয়ন।যেন রুহির জন্য আজ কোন আবেগ কাজ করছে না ওর।কোন এক মন্ত্রবলে যেন রুহির প্রতি তার মন্ত্রমুগ্ধতা কেটে গেছে।রুহি, এ কোন্ জিয়নকে দেখছে! আজ  রুহিও হতভম্ব হয়ে জিয়নের চলে যাওয়াটা শুধু দেখে চলল। ভীষণ কান্না পেল ওর,কিন্তু পরক্ষণেই রেজোলিউশনের শর্ত মনে পড়ে গেল।নিজেই নিজের জাঁতাকলে পড়ে ছটফট করতে লাগলো।ক্লাসের গ্যাপে ক্যান্টিনেও রুহি খোঁজ করলো জিয়নের।ফেরার সময় পুরো কম্পাউন্ড,ক্যাম্পাস,ক্যান্টিন,লাইব্রেরি,ইউনিয়ন রুম- তন্ন তন্ন করে খুঁজেও জিয়নের টিকি তো দূর,নিঃশ্বাসের গন্ধটুকুও টের পেল না রুহি।মন মরা বেচারি রুহি,একলা একাই কলেজ থেকে নিঃশব্দে বাড়ি ফিরে এলো।অনেক রাত পর্যন্ত হো অ্যাপ বক্সে জিয়নের মেসেজ খোঁজ করে যেতে লাগলো ও। মেঘলা মুখের ঝিল চোখ চিরে কয়েক ফোঁটা আক্ষেপ বিন্দুও ঝরে পড়লো অজান্তে, সেই মূহুর্তে।

       অনেক রাত পর্যন্ত বালিশ আঁকড়ে কেঁদে কেটে ঘুমিয়েছে রুহি।পরের দিন তাই রসবড়ার মত ফুলে যাওয়া চোখ আর নাকে তালা ঝুলিয়ে, লোকের কাছে জবাবদিহির পাত্রী হয়ে,কলেজ যেতে তার একটুও ইচ্ছে করলো না।আর তাছাড়া যাকে দেখলে,যার সাথে কথা বললে মন চনমনে হয়,গোলাপ ঠোঁটে দু'ফালি চাঁদ পিছলে যায়.........
-'নাহ থাক,ভাববো না,একটুও ভাববো না তার কথা।যে আমাকে না দেখে থাকতেই পারতো না এক মূহুর্ত,সে কিনা শর্তে জেতার জন্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে আমায় এড়িয়ে চলছে!
ভাববো না,ভাববোই না তোর কথা,জিয়ন!তুই জিতেছিস,আর আমি হেরে গেছি।সত্যিই হেরে গেছি জিয়ন,আর পারছি না এভাবে তোকে মেনে নিতে।প্লিজ কামব্যাক,জিয়ন......'
আবার খানিক অকাল বর্ষণে ভিজে গেলো চিবুক,ভিজে গেলো আবেগের পাতা।

         রুহি কলেজ আসেনি জেনেও জিয়ন সারা দিন,সারা রাতের মধ্যেও একটা মেসেজ বা টেক্স করে খোঁজ নেয়নি ওর।রুহিও চোদ্দোশো চল্লিশ মিনিট  খোঁজ নিলো না জিয়নের।একটা বিষাদময়,অপয়া তেরোই ফেব্রুয়ারী এভাবেই তাদের বোবাকান্না আর দীর্ঘশ্বাসের আড়ালে হারিয়ে গেল। দু'দিকেরই ডায়েরির পাতায়,! ব্ল্যাক মার্কারের ডার্ক সার্কেলে মার্কড হয়ে থাকলো 'আনলাকি থার্টিন'।

           আজ বাঙালীর আদিখ্যেতা দেখাবার দিন।বাবু,সোনা,নেকুপুষু-সুন্টুমুন্টু ডার্লিংদের আজ দারুন এক্সাইটমেন্টের দিন।কত রঙের গোলাপ যে আজ নিহত হবে,কত রঙীন র‍্যাপার যে আজ হাওয়ায় উড়বে অবহেলিতের মত,আর কত্ত কত্ত প্রেমিক সত্ত্বা যে আজ হিরোর মত হাঁটু মুড়ে প্রেমিকার সামনে নতজানু হবে!-সবটাই যেন একটা প্রিপ্ল্যান্ড সেলিব্রেশন।যেন সেলিব্রেশনের সেলিব্রিটি হবার জন্যই ভ্যালেন্টাইন ডে গুরুত্ব পায় প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে।ভালোবাসার দিন-ক্ষণ কি তবে  নির্দিষ্ট করা যায়! 
-'ধুর! বেকার আদিখ্যেতা সবার।যখন তখন দুমদাম করে,ইচ্ছে হলেই ভালোবাসতে নেই বুঝি!আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে যেতে নেই বুঝি!তবে কেন তিন-তিনটে বছর জিয়ন একই ভাবে,একই মুগ্ধতা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে? কেন আমি সামনে এলেই সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায় ওর?কেন ক্যাবলাকান্ত হয়ে যায় আমায় দেখে? কেন আমায় চোখে হারায় ও? হুহ! চোখে হারায় না ছাই! আজ রেজোলিউশনের নিকুচি করে,শর্তকে কুচিকুচি করে,জিয়নের সামনে উড়িয়ে দিয়ে, বুঝিয়ে দেবো যে আমিও কথা না বলে থাকতে পারি,না দেখেও থাকতে পারি।বাকিটা যা বোঝার, বুঝে নিক জিয়ন নিজেই।'
স্বগতোক্তিতে হালকা কপট রাগ বেরিয়ে এলো রুহির ভেতর থেকে।

                নিজেকে মানানসই পোষাকে মুড়ে,হাল্কা স্টোল গলায় জড়িয়ে, পিঠে স্কাইব্যাগ চাপিয়ে,নাক দিয়ে খানিক টেনে নিল একটা রোদেলা হাওয়া।কারণ,রণক্ষেত্রে নামার আগে একটা ফ্রেশ মেন্টাল প্রিপারেশনের দরকার হয়, নইলে পরাজয় সুনিশ্চিত।বাড়ির মেইন গেট পেরিয়ে,ছলছলে চোখদুটো রুহি স্মার্টলি ঢেকে নিল রোদ চশমার আড়ালে।সামনে রাস্তার দিকে এগোতে গিয়ে হঠাৎ বাউন্ডারি ওয়ালে চোখ আটকে গেল ওর।কেউ যেন ছোট্ট ছোট্ট লিফলেটের মত কিছু সাঁটিয়ে রেখেছে ওয়ালে।সন্দিগ্ধ চোখে পড়ে দেখার জন্য কাছে যেতেই.........

                 " আমার জন্য তুই পুরোটাই কাব্য
                  হিসেব করে তোর কথা কেন ভাববো!
                  চোখের আড়াল,বুক করে দুরু দুরু
                  যে চোখেতে কাজল টানিস পুরু!
                  সেই চোখেতেই ক্যাবলা কুপোকাত
                  ভাবের আঙুল জড়িয়ে দুটো হাত
                 ঠোঁট বাঁকালেই বুকের চাতাল বিদ্ধ
                 তুই হাসলেই জিয়ন-ও সমৃদ্ধ।"

          দেওয়াল লিখন পড়ে রুহি হাসবে না কাঁদবে!-বুঝে পেল না।ফ্যান্টাসিতে ভর করে সে নিজেকে মূহুর্তের জন্য সিন্ডারেলা ভেবে নিল।মন যেন হাজার প্রজাপতির পাখা মেলে ফড়ফড় করে উড়তে থাকলো।তারপর আশেপাশে চোখ কান খোলা রেখে জিয়নের উপস্থিতি খুঁজতে খুঁজতে আস্তে-ধীরে স্টেশনমুখী হল।প্ল্যাটফর্মের যেখানটাতে বসে রুহি প্রতিদিন ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করে, সেখানে পৌছতেই আবার একটা লিফলেট চোখে পড়লো ওর।তাতে বড় বড় করে লেখা.....

        "এদিক,ওদিক খুঁজিস যাকে,খুঁজিস না তো বুকের ফাঁকে!
        নজরদারি চোখের উপর,আটকে আমার গোটা শহর
       ম্যাহফিল হয় শূন্য ম্যাহেক,বিন রুহিতে যাচ্ছি ব্যাহেক
       চেনা মঞ্জিল,ছেঁড়া জঞ্জির,রেশমি সুতোয় বাঁধবি  কাকে!"

              ভাবের ঘরের আহ্লাদী রুহি আনন্দজল রুমালে মেখে নিয়ে অ্যালার্ট হল।প্ল্যাটফর্ম ছুঁয়ে আগত ট্রেনকে স্বাগত জানিয়ে রুহি লাফিয়ে উঠে পড়লো তার পেটের খুপরিতে।আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে কাঙ্ক্ষিত মানুষটির সামনে গিয়ে দাঁড়াতে চলেছে।সেটা ভেবেই সে শিহরিত হচ্ছে বারেবার।যার ভেতর এত্ত ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল,যার কবি সত্ত্বা এভাবে অপ্রত্যাশিত ভাবে প্রকাশ পেল শুধু মাত্র রুহির জন্য,তাকে খুব কাছ থেকে দু'চোখ ভরে দেখার সুপ্ত ইচ্ছেটা লাফিয়ে লাফিয়ে যেন বাড়ছে আর রুহির কাছে একটা স্টেশন পেরিয়ে পরের স্টেশনের মধ্যেকার দূরত্বটাও যেন বহু যোজন মনে হতে লাগলো।যে দূরত্বটা তার কাছে অসহ্যকর,অথচ সেই দূরত্বটাই তার কাছে মিলন-সাঁকো।তাই কখনো কখনো দূরত্ব থাকা ভালো,তাতে কাছে যাবার টান বাড়ে।সমস্ত পথটাই এভাবে জিয়নের ভাবনায় ডুবে গিয়ে রুহির অদৃশ্য হাতটা ছুঁয়ে ছুঁয়ে গেল জিয়নের বুক।আগে থেকেই তাদের গন্তব্য নির্দিষ্ট।ট্রেনটাও সেই নির্ধারিত প্ল্যাটফর্ম ছুঁয়ে রুহিকে সিঅফ করলো।প্ল্যাটফর্মে পা রাখতেই...... একটা চেনা ভরসার হাত রুহির পিঠ আগলে, ভীড় বাচিয়ে তাকে সেফ জোনে নিয়ে এল।রুহি ঘাড় ঘুরিয়ে মূর্তিমান মিষ্টার জিয়নের সিরিয়াস মুখটা দেখতে পেল। এক্সপেক্টেড ক্যাবলাকান্ত জিয়নের গালভরা হাসিটা বড্ড মিস করলো রুহি।খারাপ লাগাটা বুকের ভেতর লুকিয়ে নিয়ে আঙুল ফাঁকে শক্ত করে জিয়নের আঙুল গলিয়ে এগিয়ে চলল কাছাকাছি একটা পার্কের দিকে।

          পার্কের এক কোণে, ঝিলের ধারে একটা ফাঁকা বেঞ্চে, রুহিকে বসিয়ে দিয়ে জিয়ন একটু ফ্রেশ হবার ছুঁতোয়, রুহির চোখের আড়ালে হলো।একলা রুহি ঝিলের জলে রোদের ঝিলিমিলি কাটাকুটি খেলায় চোখ বসালো।রুদ্র তাপসও বুঝি মজার ছলে একলা,আনমনা রুহিকে একটু উষ্ণ করার খেলায় মাতলো।ঝিলের বুকে রোদের আদর-খেলা দেখতে দেখতে গলার স্টোলটা আনমনে খুলে,বেঞ্চের উপর রাখতে গিয়েই- একটা খচমচ শব্দে, ভাবের ঘোরটা কেটে গেল রুহির।স্টোল সরাতেই চকচক করে উঠলো সেলোফিন মোড়া গুলদস্তা আর তার ঠিক নীচ থেকে উঁকি দিলো একটা সুদৃশ্য ডায়েরির কিয়দংশ।ফুলগুলোতে হাত রাখতে গিয়েই রুহির চোখ পড়লো-তার পায়ের ঠিক কাছেই ঘাসের উপর পড়ে আছে একটা বড়োসড়ো বেলুন হৃদয়।অনাদরে পড়ে থাকা আদরের হৃদয়কে সযত্নে যেই বুকের কাছে চেপে ধরলো রুহি,অমনি সশব্দে অপ্রত্যাশিত ভাবে বিদীর্ণ হল বেলুন হৃদয়।রুহি আচমকা ঘটে যাওয়া ব্লাস্টে ডুকরে উঠে মুখ ঢাকলো হাতের পাতায়।আর ঠিক তখনই আবার সেই চেনা ভরসার হাত ওর হাতের আড়াল সরিয়ে,মুঠোবন্দি করলো রুহির কাঁপা কাঁপা হাত।রুহি অবাক হয়ে শুধু দেখলো তার পায়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে আছে জিয়ন, আর আসেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে বেশ কয়েকটা চকলেট হার্ট।রুহির বাচ্চা মন ফ্যান্টাসিতে ভাসতে ভালোবাসে,কিন্তু, সেই ফ্যান্টাসি যে বাস্তবে তাকে ধরা দেবে,এমনটা সে কক্ষণো ভাবেনি।বিস্ময়ের চমকে রুহি কথা হারিয়ে শুধু দেখে চলেছে জিয়নকে।গুলদস্তাকে বেঞ্চ থেকে সযত্নে উঠিয়ে রুহির কোল ভরে দিল জিয়ন।পাশে রাখা ডায়েরিটাও তুলে দিল রুহির অন্য হাতের তালুতে।

-"রুহি! ঘোরের চাদর ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে একবারটি দেখ,তোর এই নতুন জিয়ন,তোর মনের মতন হল কিনা!"

রুহির ঠোঁট তিরতির করে কেঁপে উঠলো অনেক কিছু বলার জন্য,কিন্তু ভাষা হারিয়ে এক ঝটকায় জিয়নকে জাপ্টে ধরলো শক্ত করে।মনের বাঁধ খুলে ততক্ষণে স্রোতস্বিনী কান্নারা ভিজিয়ে দিয়েছে জিয়নের শক্ত চওড়া কাঁধ।আর কানের কাছে একটা অভিমানী ঠোঁট বলে চলেছে.......

-"নিকুচি করেছি রেজোলিউশনের।যে রেজোলিউশনে দূরত্ব বাড়ায়,কষ্টের নুড়ি জমিয়ে দেয় বুকের বাঁ-পাশে,যে রেজোলিউশন ক্যাবলাকান্তের দন্ত বিকশিত হাসি কেড়ে নেয়,সে রেজোলিউশনের ভেন্টিলেশনেই থাকা ভালো।আর কক্ষনো যদি এমন রেজোলিউশনের কথা মুখে আনিস!তবে ভালো হবে না বলে দিলাম।"

"-কি হবে শুনি! বিপদ যদি আগে থেকে ঘন্টা বাজিয়ে সংকেত দেয়,তবে না হয় বর্ম পরেই রণক্ষেত্রে নামবো"।
চওড়া হাসি ঠোঁটে সাজিয়ে নিয়ে জিয়ন বলে উঠলো।

-"তবে রে!ইয়ার্কি হচ্ছে!আজ তোরই একদিন কি আমারই........ "

হঠাতই ঝড় ওঠার পুর্বাভাস দিয়ে,থমথমে নীরবতার বুক চিরে বেরিয়ে এলো একটা মৃদু চকাস শব্দ।ঘাসের বুকে গুলদস্তাও লেপ্টে থাকলো আদরে আর তার ঠিক পাশেই খোলা ডায়েরির বুকে কিছু কালিমাখা শব্দের উপর দোল খেয়ে গেল একজোড়া ঝুমকো কানের দুল......
  
        তোর জন্য গ্ল্যাডিওলাস,বাদের খাতায় গোলাপ ফুল
        ডেইজি আছে অপেক্ষাতে,ডায়েরি ভাঁজে কানের দুল
         বেলুন বুকে চকলেটি হার্ট,আর কি দেবো বল!
         দীঘল চোখে মানায় না যে হিরের কুচি-জল
         ঝগড়া হলে করতে পারি কান ধরে উঠ-বোস
         নুইয়ে মাথা করবো স্বীকার,সবটা আমার দোষ
         লুকিয়ে কাঁদিস,রাগও দেখাস,পুষিস অভিমান!
         বুকের ভেতর রুহির ডেরা,রামধনু আসমান।
         তোকেই পড়ি,তোকেই লিখি,উপন্যাস বা কাব্য
         বারণ থাকুক উপেক্ষাতে,তোকেই শুধু ভাববো।।

              ---------মধুরেণ সমাপয়েৎ-------

        

Comments

Popular posts from this blog

অনিন্দিতা

কোথা তুমি প্রাণধন